ফুল চাষ-অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

কৃষিবিদ প্রদীপ হাজং:ফুল সৌন্দর্য্যরে প্রতীক, দৃষ্টির খোরাক, মনের এবং আত্মার তৃষ্ণা মিটায়। আমরা সবাই কম বেশি ফুলের গাছ লাগাই, ফুলের বাগান করি, বাসাবাড়ির আঙিনা ভরিয়ে দেয় ফুলে ফুলে। ফুল ভালোবাসে না এরকম মানুষ পাওয়া খুব দুষ্কর, আমরা সবাই ফুল ভালোবাসি। ফুল ভালোবাসা প্রকাশের একটা মাধ্যম। মানুষ তার প্রিয়জনকে ফুল উপহার হিসেবে দিতে ভালোবাসে। তাইতো কবি বলেছেন যদি একটি পয়সা থাকে তাহলে খাদ্য কিনিয়ো খোদার লাগি, আর যদি দুটি পয়সা জোটে তাহলে ফুল কিনে নিয়ো হে অনুরাগী।

মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এখন বিনোদন, ভ্রমণ, প্রকৃতির সানিধ্য সেই সাথে ফুলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য সমান গুরুত্ব দেয় এবং তার জন্য অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত। এজন্য বর্তমানে ফুলকে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা হচ্ছে এবং দিন দিন এর চাহিদা এবং বাজার বাড়ছে। ফুল শুধু প্রিয়জনকে খুশি করার জন্য দেয়া হয় তা নয়, ফুল এখন বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয়, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদিতে ব্যবহার করা হয়। এই ফুল সরবরাহ করার জন্য দেশেই এখন ফুল চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার সাথে একটা বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

ফুল চাষ এখন একটি অর্থকরী ফসল এবং এটি একটি লাভজনক ফসল। ফুল বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহার এবং বিক্রি হয়, যেমন মঞ্চ সাজানো, গাড়ী সাজানো, বাসর ঘর সাজানো, মালা তৈরি, ফুলের তোড়া, মুকুট, পুষ্পাঞ্জলী ইত্যাদি। বিভিন্ন দিবস যেমন নতুন বছর উদযাপন, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ, শোক দিবস, বিজয় দিবসসহ অনেক দিবসগুলোতে ফুলের ব্যবহার এবং বিপণন হয়। এছাড়াও জন্মবার্ষিকী, বিবাহবার্ষিকী, অভিনন্দন জ্ঞাপন, স্বাগত সম্ভাষন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফুলের অনেক ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে গ্লাডিওলাস, গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, জুঁই, ক্যালেন্ডুলা, জিপসিসহ আরও অনেক ফুল চাষ করে। যদিও বাগান বাড়ির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য আরও অনেক রকমের ফুল, লতাপাতা, অর্কিড লাগানো হয়। তবে সম্প্রতি বিদেশী ফুল টিউলিপ এবং লিলিয়াম দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় চাষ করা হচ্ছে এবং কৃষকরা বেশ ভালো দামে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি এর তথ্য মতে দেশে বর্তমানে বিশ হাজার কৃষক ফুল চাষের সাথে জড়িত। কয়েক হাজার লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ফুল বিপণন এর সাথে জড়িত। শুধু যশোর জেলায় বিশেষ করে গদখালী ইউনিয়নে পাঁচ হাজার কৃষক ফুল চাষ করে এবং এখানে ফুলের বিরাট একটা বিপণন ব্যবস্থ (মার্কেটিং চ্যানেল) গড়ে উঠেছে। আশির দশকে প্রগতিশীল কৃষক শের আলীর হাত ধরে যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিলো তা এখন দেশের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং ফুলের একটা হাব (অঞ্চল) গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ফুলের অর্থনীতি প্রায় পনের শত কোটি টাকার মতো যা কল্পনাতীত এবং তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও গত দু’বছরে কোভিড পরিস্থিতির কারণে ফুল তেমন বিক্রি করতে পারেনি এবং অনেক কৃষক লোকসানের সমুখিন হলেও এখন তা ঘুরে দাড়িয়েছে।

কৃষকদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন ফুলের লাভক্ষতির একটা চিত্র পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা গ্লাডিওলাস চাষ করে সত্তর থেকে আশি হাজার টাকা লাভ করা যায়, যেখানে রজনীগন্ধা চাষ করে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। তবে সবচেয়ে কম খরচে, কম সময়ে কম টাকা বিনিয়োগ করে গাঁদা ফুলের চাষ করে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা আয় করা যায়। সবচেয়ে বেশি খরচ লভ্যাংশ (বিসিআর) হলো জারবেরা চাষ, যদিও এর প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক বেশি এবং বেশ ঝুঁকিপূর্ণ চাষাবাদ। এক বিঘা জমিতে একটা জারবেরা শেড করে চারা লাগানোসহ প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ লক্ষ টাকা খরচ হয় যা অনেক কৃষক করতে পারে না। তবে বছরে দুই থেকে তিন লক্ষ টাকা আয় করতে পারে, যদিও রোগ বালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কম হতে পারে। আরেকটি বহুবর্ষজীবী ফুল হলো গোলাপ, যা এক বার লাগালে অনেক বছর ফুল পাওয়া যায়। শুধু প্রতি বছর প্রুনিং করতে হয়, তার সাথে রাসায়নিক সার এবং অন্যান্য পরিচর্যা করতে হয়। গোলাপ চাষেও প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও বিঘা প্রতি দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা আয় করা যায়।  

তবে এতো সম্ভাবনার মধ্যেও ফুল চাষে কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয় যেমন, ফুলের দামের উঠানামা, পরিবহন সমস্যা, ফুলের বীজ (কর্ম) ও ফুল রাখার জন্য কোল্ড স্টোরেজ এর অভাব, পোকামাকড়ের আক্রমণ ইত্যাদি ফুল চাষ বৃদ্ধির অন্তরায় বলে মনে করা হয়। ফুল চাষি এবং ব্যবসায়িদের দাবি তারা যেন সরকারী সহযোগীতায় স্বল্প মূল্যে, স্বল্প সময়ে ট্রেন, বিমান ইত্যাদির মাধ্যমে ফুল পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়। তাহলেই ফুল একটি বাণিজ্যিক চাষাবাদ, ফুল ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে উঠবে এবং বিদেশেও ফুল রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।

লেখক:বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, যশোর