ধান চাষে উচ্চ তাপমাত্রার ঝুঁকি ও করণীয়

সমীরণ বিশ্বাস:ধান চাষে উচ্চ তাপমাত্রার ঝুঁকি ও করণীয়: কৃষকের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো ধান। দেশের অধিকাংশ কৃষক তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ধান উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে উচ্চ তাপমাত্রা ধানের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা, পরাগায়ন এবং দানা গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোকে ব্যাহত করছে। ফলে ধান চিটা হওয়া, ঝলসে যাওয়া এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

ধান গাছের জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল। সাধারণভাবে ২০–৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ধানের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এই সীমার মধ্যে গাছের বৃদ্ধি ও বিকাশ স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু তাপমাত্রা যখন এই সীমার বাইরে চলে যায়, তখন গাছের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা ধানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ধান চিটা হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফুল ফোটা ও পরাগায়ন পর্যায়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা। এই সময়ে যদি দিনের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়, তবে পরাগায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং দানা পূর্ণতা পায় না। ফলে ধানের শীষে অনেক দানা ফাঁকা থেকে যায়, যা কৃষকের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। একইভাবে, রাতের তাপমাত্রা যদি ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে, তাহলে গাছের শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায় এবং সঞ্চিত খাদ্যশক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়। এতে দানা ভরাট বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন কমে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দেরিতে ধান রোপণ করা। অনেক কৃষক নানা কারণে নির্ধারিত সময়ের পরে চারা রোপণ করেন। ফলে ধানের ফুল ফোটা ও দানা ভরাট পর্যায়টি চৈত্র ও বৈশাখ মাসের তীব্র গরমের মধ্যে পড়ে। এতে করে তাপজনিত ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া ঝড়ো হাওয়া ও শুষ্ক আবহাওয়া ধানের পরাগায়ন প্রক্রিয়াকে আরও বাধাগ্রস্ত করে।

স্থানীয় পরিবেশগত কারণও ধান চাষে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ইটভাটার কাছাকাছি জমিতে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে। ইটভাটা থেকে নির্গত তাপ ও ধোঁয়া ধান গাছের জন্য ক্ষতিকর। এতে গাছ ঝলসে যায়, পাতার রং পরিবর্তিত হয় এবং দানা তিতা বা অপুষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, সঠিক সময়ে ধান চাষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্তিক মাসের মধ্যে ৪০–৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে ধানের ফুল ফোটা পর্যায়টি তুলনামূলক কম তাপমাত্রার সময়ে সম্পন্ন হয়। এতে করে উচ্চ তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, স্বল্প মেয়াদী ও তাপ সহনশীল ধানের জাত নির্বাচন করা উচিত। বর্তমানে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কিছু জাত উদ্ভাবন করেছে, যা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। এই জাতগুলো ব্যবহার করলে কৃষকরা কম ঝুঁকিতে ভালো ফলন পেতে পারেন।

তৃতীয়ত, জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান জমিতে ২–৫ সেন্টিমিটার পানি থাকলে মাটির তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং গাছের ওপর তাপের প্রভাব কমে। বিশেষ করে দুপুরের সময় জমি শুকিয়ে গেলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, যা গাছের জন্য ক্ষতিকর। তাই জমিতে নিয়মিত সেচ নিশ্চিত করতে হবে।

 চতুর্থত, পটাশ সার প্রয়োগ ধান গাছের তাপ সহনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পটাশ গাছের কোষ শক্তিশালী করে এবং পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ফলে গাছ তাপজনিত চাপ মোকাবিলা করতে পারে। সঠিক মাত্রায় পটাশ সার ব্যবহার করলে গাছ সুস্থ থাকে এবং দানা ভরাট ভালো হয়।

পঞ্চমত, ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কৃষি জমির পাশে ইটভাটা থাকলে তা সরিয়ে নেওয়া বা নতুন করে অনুমোদন না দেওয়া উচিত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ধান চাষে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, উচ্চ তাপমাত্রা ধান উৎপাদনের জন্য একটি বড় হুমকি হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কৃষকদের সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।