
সমীরণ বিশ্বাস:বিশ্বে সাইট্রাস (লেবুজাতীয় ফল লেবু, কমলা এবং মাল্টা) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল। উৎপাদনের দিক থেকে পৃথিবীর ফলগুলোর মধ্যে এর স্থান দ্বিতীয় কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিক থেকে এ ফলের স্থান প্রথম। বাংলাদেশের আবহাওয়া লেবুজাতীয় ফল (বিশেষ করে এলাচিলেবু, কাগজিলেবু, জাম্বুরা, কমলা এবং মাল্টা বেশি ভালো হয়) উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। এ দেশে লেবুজাতীয় ফলের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে লেবু একটি অত্যাবশ্যকীয় ফল। যা খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এমনকি শরবত তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
লেবুর সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং মারাত্মক একটি রোগের নাম হল ক্যাংকার রোগ। এটি একটি ব্যাক্টেরিয়া জনিত রোগ। এ রোগের জীবণু মাটিতে ৮-১০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আলো বা রোদে তা দ্রুত ধ্বংস হয়। গাছের মাটির নিচের অংশ ছাড়া বাকি পাতা, ফল ও কান্ডের সব অংশে এ রোগ আক্রমণ করে। সাধারণত গাছের ক্ষত অংশ এবং পত্ররন্ধ্র দ্বারা জীবাণু গাছের ভেতর প্রবেশ করে। এজন্য বর্ষাকালে অধিক বাতাসে গাছের ক্ষতের সৃষ্টি হলে জীবাণু দ্বারা আক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
রোগের লক্ষণঃ
ক্যাংকার রোগের আক্রমণের ফলে গাছের শাখা-প্রশাখা, ফল, পাতা, ফলের বোঁটা, ডগা প্রভৃতি আক্রান্ত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত স্থানে ছোট ছোট হলুদ দাগ পড়ে। পরবর্তীতে এই দাগ একত্রিত হয়ে পুরু ও বড় হয়। ফোস্কার মত এসব দাগের চারিদিকে হলুদ আভা থাকে। হলুদ আভা গাছের পাতায়ই বেশি দেখা যায়। কখনো কখনো ফলের খোসায় ফাটল দেখা যায়। গাছের উপরের দিকের পাতা ঝরে যায়। এ রোগের আক্রমনে পাতায় , ফলে ও কান্ডে উচু বাদামী ফোস্কা দাগ পড়ে। পাতার উপরে এবং নিচে উভয় দিকে বাদামী রঙের ফোসকা পড়ে। প্রথমে পাতায় হলুদ দাগ পরে যা ক্রমান্বয়ে বাদামী দাগে রূপ নেয়। ঝড় বৃষ্টির সময় এই রোগ বেশি দেখা যায় কারণ ইহা পানি বাহিত ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন। পুরাতন পাতায় আক্রান্ত হয় এবং পাতা ঝরে পড়ে। নতুন পাতার বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং বিকৃতি ধারণ করে । আক্রমণ তীব্র হলে গাছ মরে যায়।
রোগের কারণঃ
লেবুর পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকার আক্রমন এ রোগ ডেকে আনে। ঝড় বৃষ্টির সময় এই রোগ বেশি দেখা যায় কারণ ইহা পানি বাহিত ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন। বর্ষা মৌসুমে এই রোগ বেশি দেখা যায় কারণ ইহা পানি বাহিত ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন। অতিরিক্ত ঠান্ডাও ভেজা অবস্থা। খেতে পানি জমে থাকা। গাছে পুষ্টির অভাব।
জৈব ব্যবস্থাপনাঃ
বাগান তৈরির প্রাথমিক অবস্থায় চারার নির্দিষ্ট সঠিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে একটি চারা থেকে অন্য চারার এবং এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব একটু বেশি দেওয়া ভালো। যাতে ঝড়ো হাওয়ায় কোন অংশে গাছের কোন ক্ষত সৃষ্টি না হয়। সুস্থ-সবল মাতৃগাছ থেকে লেবুর রোগমুক্ত চারা সংগ্রহ করতে হবে। ওই চারা জমিতে রোপণ করতে হবে। পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা দমনের জন্য প্রতিনিয়ত লেবুর ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে। পোকার আক্রমণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দমনের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগাক্রান্ত পাতা, ডালপালা, ফল সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। গাছের পাতা শুকনো থাকা আবস্থায় বাগানের পরিচর্যা করা। বর্ষা মৌসুমের আগেই লেবু গাছের ডাল ছাঁটাই করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ছাঁটাইয়ের পর সঠিক মাত্রায় বোর্দোমিক্সার প্রয়োগ করতে হবে। ক্যাংকার রোগে আক্রান্ত মরা গাছ তুলে দ্রুত তা সমূলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
রাসায়নিক ব্যবস্থাপনাঃ
কপার অক্সিক্লোরাইড বা কপার প্রতি ১ লি. পানিতে ১.৫ গ্রাম. মিশিয়ে ৪ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করতে হবে। ঝড় বৃষ্টির সময় এই রোগ বেশি দেখা যায়। তাই সারা বৃষ্টির সময় জুড়ে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে স্প্রে করতে হবে। প্রতিরোধমূলক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
সাবধানতাঃ
সকাল বা বিকালে (রোদ কম থাকলে) স্প্রে করা উত্তম। অতিরিক্ত ব্যবহার করবেন না। বৃষ্টি হলে পুনরায় স্প্রে। স্প্রে করার সময় গ্লাভস, মাস্ক ব্যবহার করুন। স্প্রে শেষে হাত-মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। সাধারণত ৭–১০ দিন আগে স্প্রে বন্ধ রাখা উচিত। শিশুদের নাগালের বাইরে, শুষ্ক ও ঠান্ডা স্থানে রাখুন।
লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।