কুয়াশার ঝুঁকিতে কৃষি: চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

Category: গবেষণা ফিচার Written by Shafiul Azam

সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের কৃষিতে শীত মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বোরো ধান, গম, আলু, সরিষা, ডাল, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফলের চাষ ব্যাপকভাবে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীত মৌসুমে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কুয়াশা শুধু দৃষ্টিসীমা কমায় না, বরং এটি ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ফলন ও গুণগত মানের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বৈজ্ঞানিকভাবে কুয়াশা হলো বাতাসে ক্ষুদ্র জলকণার ঘন উপস্থিতি, যা সূর্যালোককে বাধাগ্রস্ত করে এবং বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯০–১০০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এই পরিবেশ ফসলের জন্য কেন ক্ষতিকর, তা নিচে ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

সূর্যালোকের ঘাটতি ও আলোকসংশ্লেষ ব্যাহত হওয়া:

ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হলো আলোকসংশ্লেষ (Photosynthesis)। গাছ সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই–অক্সাইড ব্যবহার করে নিজের খাদ্য তৈরি করে। কিন্তু অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে : সূর্যের আলো পাতায় পৌঁছাতে পারে না। আলোর তীব্রতা (Light Intensity) কমে যায়। আলোকসংশ্লেষের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এর ফলে গাছ পর্যাপ্ত শর্করা ও শক্তি তৈরি করতে পারে না। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে, গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। কুশি, ডাল ও শাখা–প্রশাখা কম হয়। ফুল ও ফল ধারণ ব্যাহত হয়। শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। ধান, গম ও সরিষার মতো ফসলে কুয়াশাজনিত আলোর ঘাটতি সরাসরি দানা গঠনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পাতায় দীর্ঘ সময় ভেজাভাব ও রোগের বিস্তার:

কুয়াশার অন্যতম বড় ক্ষতিকর দিক হলো পাতার ওপর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকা। সাধারণত সূর্যের আলো ও বাতাসে সকালে পাতার শিশির শুকিয়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত কুয়াশায় : পাতার ভেজাভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। পাতা ও কাণ্ডে আর্দ্র মাইক্রোক্লাইমেট তৈরি হয়। এই অবস্থা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের জন্য আদর্শ পরিবেশ। যেমন, ধানে ব্লাস্ট ও শীথ ব্লাইট। আলু ও টমেটোতে লেট ব্লাইট। শশা, কুমড়া, তরমুজে ডাউনি মিলডিউ। শাকসবজিতে লিফ স্পট ও সফট রট। ছত্রাকের স্পোর ভেজা পাতায় দ্রুত অঙ্কুরিত হয় এবং খুব অল্প সময়ে পুরো জমিতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কৃষককে অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়ায় এবং পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।

তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া:

অতিরিক্ত কুয়াশা বাতাসের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ভারসাম্য নষ্ট করে। এর ফলে, বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। গাছের বাষ্পোৎসর্জন (Transpiration) কমে যায়। শিকড় থেকে পানি ও পুষ্টি গ্রহণের গতি ব্যাহত হয়। বাষ্পোৎসর্জন কমে গেলে গাছের ভেতরে পানি ও পুষ্টির চলাচল ব্যাহত হয়, ফলে গাছ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে এতে গাছের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরাগায়নে সমস্যা ও ফল ধারণ হ্রাস:

ফুলধরা ফসলের ক্ষেত্রে কুয়াশার প্রভাব আরও মারাত্মক। যেমন, সরিষা, ডাল, ফল ও বিভিন্ন সবজি। অতিরিক্ত কুয়াশায়: ফুলের পরাগ শুকাতে পারে না। পরাগরেণু আঠালো হয়ে যায়। মৌমাছি ও পরাগবাহি পোকামাকড়ের চলাচল কমে যায়। ফলে পরাগায়ন ব্যাহত হয় এবং ফুল ঝরে যায়। ফলের সংখ্যা কমে। দানা ও বীজ পূর্ণতা পায় না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মোট উৎপাদনের ওপর।

পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বৃদ্ধি:

স্যাঁতসেঁতে ও কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ অনেক পোকামাকড়ের বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী। যেমন, এফিড, থ্রিপস,  মাইট, জাবপোকা এই পোকাগুলো শুধু রস শোষণ করে না, অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাস রোগও ছড়ায়। দুর্বল ও রোগাক্রান্ত গাছে এসব পোকার আক্রমণ আরও দ্রুত হয়, ফলে জমিতে রোগ–পোকার সম্মিলিত ক্ষতি দেখা দেয়।

ফল ও সবজির গুণগত মান হ্রাস:

অতিরিক্ত কুয়াশার প্রভাবে শুধু ফলনই নয়, ফসলের গুণগত মানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন, ফল ও সবজির স্বাভাবিক রঙ ঠিকমতো আসে না। শর্করা ও শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ কমে যায়। সংরক্ষণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। পরিবহন ও বাজারজাতকরণে পচন বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং বাজারে কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়।

কৃষকের করণীয় ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা:

অতিরিক্ত কুয়াশার ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনায় ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়, সকালে জমিতে হালকা নিড়ানি ও আগাছা দমন করে বাতাস চলাচল বৃদ্ধি। অতিরিক্ত সেচ এড়িয়ে চলা। রোগ দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ছত্রাকনাশক ব্যবহার। রোগ সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাত নির্বাচন। সুষম সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি। জমিতে পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখা।

সংক্ষেপে বলা যায়, অতিরিক্ত কুয়াশা ফসলের আলোকসংশ্লেষ কমায়, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ায় এবং ফলন ও গুণগত মান, উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানভিত্তিক, ডিজিটাল এবং স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কৃষকের টিকে থাকার প্রধান উপায়।

লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।